NNTV
প্রকাশ : Nov 6, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হয়, বদলায় না রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র

গত ১৮ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় ধারালো অস্ত্র নিয়ে রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে একদল ব্যক্তি। একপর্যায়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় তাকে । পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।


রিপন মিয়া স্থানীয় যুবদলের নেতা ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষায়, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ সম্প্রতি তীব্র হয়ে উঠেছিল। সেই বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।

রিপনের মেয়ে শিলা বলেন, ‘কয়েকজন লোক আমার বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়েছে।’

স্থানীয় বিএনপির সভাপতি এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের বিরোধকে দায়ী করেছেন।


চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর (জামায়াত) সমর্থকদের সংঘর্ষেও প্রাণ হারান দুই ভাই। পুলিশ জানায়, রমজানে ইফতারের পর কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান হাফিজুর রহমান। তার ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এ ঘটনার জন্য বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দায়ী করে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করার পর তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা এবং দলটির স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের সাবেক এক নেতাও রয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা

সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ। দেশটির মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নথি, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে, একই দলের অভ্যন্তরে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বিভিন্ন সরকারের আমলেই ঘটেছে।

আসকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি। এসব সংঘর্ষে ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হয়েছেন।

এই পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের পাশাপাশি নির্বাচিত সরকারের আমলের ঘটনাও রয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। তার শাসনামলকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর প্রধানত রাজনীতির বাইরের ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে।

তবে সরকারের এই পালাবদলের মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে—স্থানীয় পর্যায়ে কার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে সংঘর্ষে মানুষের প্রাণহানি। রাজনৈতিক সহিংসতার এ সমস্যা কোনো একটি সরকারের আমলের নয়; একাধিক সরকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও তা অব্যাহত রয়েছে।

২০০২ সাল থেকে পাওয়া তথ্যেও একই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। দলের পদ, ব্যবসা, জমি কিংবা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকাও স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিরোধ নয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের (আ.লীগ) পারস্পরিক বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের আসকের পরিসংখ্যানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২৮৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হন ৫৫ জন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৩৭ জন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় আসকের এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শরিক ছিল ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় দলটির দুজন সদস্যও ছিলেন। তবে রাজনৈতিক জোটে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ থামেনি।

রওনক জাহানের গবেষণায় উল্লেখ করা আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন আটজন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সংঘর্ষ কমলেও বন্ধ হয়নি দমন-পীড়ন

২০০৭ ও ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ওই দুই বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল আটটি, এতে নিহত হন দুজন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল একটি; এতে কেউ মারা যাননি।

প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষও কমে ৩২টিতে নেমে আসে। এসব ঘটনায় নিহত হন সাতজন। সব কটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সংঘর্ষে। তুলনামূলকভাবে, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষেই ১১৮ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট প্রাণহানি ছিল নয়জন।

তবে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, ওই সময়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ছিল না। জরুরি অবস্থার মধ্যে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বিধিনিষেধ ছিল। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ ও সংঘর্ষের সুযোগ এবং পরিবেশ—দুটিই বদলে গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দলীয় সংঘর্ষ বৃদ্ধি

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠনের পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ বেড়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৭৯৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন ৯৭ জন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২২৯টি, যাতে ২১ জন নিহত হন।

তবে এসব পরিসংখ্যানে দুই দলের জন্য সমান সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি তুলে ধরাই এখানে মূল বিষয়; কোনো সরকারকে অন্য সরকারের সঙ্গে তুলনা করে অবস্থান নির্ধারণ করা নয়।

স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিয়মিত সহিংসতার কারণ হলেও জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাতের সময় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি বেড়েছে।

২০১৩ সালে বিতর্কিত নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠলে আসকের হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। সংস্থাটির বার্ষিক তালিকায় হরতালকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১৮৫ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরও ৮৫ জন নিহত হন।

ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। আসকের মূল বার্ষিক নথিতে জামায়াত, দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের পৃথক হিসাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে শিক্ষার্থীকে

1

জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করা, কারখানার ক্ষতির উদ্দেশ্যে এই আন্

2

নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টসকর্মী সাদিয়া হত্যা: পরকীয়া প্রেমিক গ্র

3

নিরাপত্তা নারায়ণগঞ্জ: জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা

4

ভারতকে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের কড়া হুঁশিয়ারি

5

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

6

ঈদের পূর্বে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শ

7

শাজাহানপুরে ছুরিকাঘাতে একজন নারী আহত

8

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ নিহত ২ জন

9

শুরু হয়েছে বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দি

10

হাদি হত্যার বিচার দাবিতে চতুর্থ দিনেও শাহবাগে সড়ক অবরোধ।

11

গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ করা ৩ হাজার

12

বিশ্বকাপের ফাইনালে জিততে পারলো না লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা

13

পাকিস্তানে শপিংমলে আগুন, ৫ জনের মৃত্যু

14

চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে তদারকির ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রী

15

হবিগঞ্জে পিকআপ ও টমটমের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাছ ব্যবসায়ী মৃত্য

16

ট্রাম্পের টার্গেটে রয়েছে ৫ দেশ

17

আজ প্রচারের শেষ দিন ,নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১ দল

18

অ্যাস্টন ভিলা নিজেদের স্কোয়াড আরও শক্তিশালী করলো

19

আবারও সুন্দরবনের বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর আত্মসমর্পণ

20