জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারনে বাড়ছে লোডশেডিং। রাজধানীতে এখনো তা তীব্র না হলেও গ্রামাঞ্চলে দিনে লোডশেডিং হচ্ছে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। আকস্মিক অস্বাভাবিক লোডশেডিং হওয়ায় গরমের মধ্যে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। দিনে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাতে লোডশেডিং বাড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল সমস্যার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়লা চলে আসায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় আবার চালু হচ্ছে। তাঁদের আশা, শিগগিরই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে লোডশেডিং থাকবেই বলেও তাঁরা জানান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুত্সংকট শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি এখন অর্থনীতি, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি পর্যন্ত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় দেশে ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। তখন চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল দুই হাজার ২৬ মেগাওয়াট। পরে বিকেলে উৎপাদন বাড়ানো হলে লোডশেডিং কিছুটা কমে আসে। বিকেল ৫টার দিকে ১৪ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন করা হয় ১৩ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট।
তখন লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৩২ মেগাওয়াটের মতো। বিপিডিবির তথ্য বলছে, আগামী মাসে বিদ্যুতের চাহিদা উঠতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে। পর্যাপ্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা না গেলে এই বাড়তি চাহিদার সময় ব্যাপকভাবে লোডশেডিং হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি দেখা দিলেও এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হয়েছে। পাশাপাশি এসএস পাওয়ার প্লান্টের একটি ইউনিটও পূর্ণ সক্ষমতায় (ফুল লোডে) উৎপাদনে যাচ্ছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় তাদের উৎপাদন সর্বোচ্চ থাকে। এসব মিলিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। ফলে দুপুরের পর থেকে লোডশেডিং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
মো. জহুরুল ইসলাম আরো বলেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আসছে এবং আনলোড প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই সেখান থেকেও উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে হঠাৎ করে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে এবং এসএস পাওয়ার প্লান্টে কয়লা সরবরাহে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো বাড়বে এবং পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির মজুদও ফুরিয়ে আসছে। ফলে দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বর্তমানে সরকারি হিসাবে বিদ্যুতের ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের বকেয়া, ভর্তুকির ঘাটতি, জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত—সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন গভীর আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ফলে সামনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। সাত-আট মাস ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা চরম সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে আমদানি করা বিদ্যুতের বিলও বকেয়া পড়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত গতকাল বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আমাদের প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মাত্র প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল থাকলে বেসরকারি খাত থেকে আরো অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ সম্ভব ছিল। তেলসংকটের কারণে উৎপাদনে রেশনিং করা হচ্ছে এবং মোট সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, যা শিগগিরই ২০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে লোডশেডিং আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ডেভিড হাসানাত বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া বিল ও ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তেল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, আর আমদানি করতেও প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে। ফলে দ্রুত সংকট কাটানো সম্ভব নয়। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহও কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। মে মাসে সংকট তীব্র আকার নিতে পারে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে এবং বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিপাকে শিল্প ও ব্যবসা : গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারখানাগুলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হালকা ও মাঝারি শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব : লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে কৃষি খাতে। বিদ্যুত্চালিত সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বোরো ধানের চাষ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সেচের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলের জমি। মাছের হ্যাচারিগুলোতেও বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ধানের ফলন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বরিশাল নগরী ও আশপাশের এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে, পরের ঘণ্টা নেই—এমন অনিয়মিত সরবরাহে ব্যবসা-বাণিজ্য, পানি সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। রাতেও একই পরিস্থিতি চলায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার এবং বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ময়মনসিংহে। নগর ও গ্রামে পালাক্রমে লোডশেডিং চলছে। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও মাছ চাষিরা। সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ফসল উৎপাদন ও মাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ঝিনাইদহে অনিয়মিত লোডশেডিংয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময়সূচি ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও ছোট ব্যবসাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাবনায় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, আর গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো খারাপ। একইভাবে নেত্রকোনা, মেহেরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে দিন-রাত লোডশেডিং বেড়ে গেছে এবং জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
ঢাকার ধামরাইয়ে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি, জ্বালানিসংকট এবং জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্রীষ্ম মৌসুমে জনভোগান্তি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।