উপসাগরীয় যুদ্ধের পর নজিরবিহীন বিপর্যয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিত্রদেশ’ খ্যাত কুয়েত। পারস্য উপসাগরের তীরের দেশটি পুরো এক মাস ধরে একটি ব্যারেল তেলও রপ্তানি করতে পারেনি।
একটি শিপিং মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি কোনো তেল রপ্তানি করতে পারেনি। যা ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এই প্রথম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থার মূল কারণ হরমুজ প্রণালীতে চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে সাধারণ সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করে তেল রপ্তানি স্থগিত করে।
কুয়েত দৈনিক প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে আসছিল। এর মধ্যে রপ্তানি করত ১.৮৫ মিলিয়ন ব্যারেল। এই রপ্তানি করা তেলের সিংহভাগই পৌঁছে যেত চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোতে।
দেশটির অর্থনীতির জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েতের মোট জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ আসে তেল খাত থেকে। একইসঙ্গে সরকারের বাজেট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভর করে পেট্রোলিয়াম রপ্তানির ওপর।
তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে দেশটির উৎপাদন কমে দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। উৎপাদন কিছুটা চালু থাকলেও রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে।
ট্যাঙ্কার ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, এপ্রিলজুড়ে কুয়েত কোনো তেল রপ্তানি করেনি। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের আগ্রাসনের কারণে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংকটের প্রভাব পড়েছে । বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
ইরান এই প্রণালী ‘শত্রু জাহাজ’-এর জন্য বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র কুয়েতে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা রয়েছে। যা দেশটিকে এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। জ্বালানি তেলের বাজারেও দেশটির অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। তা না হলে কুয়েতসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।