১৯ বছর (২০০৭) শিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমিরসেদিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, একটি মাত্র শক্তির অধীনে পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না। এমনকি খোদ সেই অধিপত্যবাদী শক্তির জন্যও তা ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়াবে। আমেরিকা একতরফাভাবে নিয়ম তৈরি করবে আর বাকি বিশ্বকে তা মেনে নিতে বাধ্য করবে।
পুতিনের সেই ভাষণের এক দশক আগেই আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছিল এবং কসোভো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষে যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণের নেতৃত্ব দিয়েছিল। পুতিন সে সময় সতর্ক করেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে নেওয়া এসব একতরফা পদক্ষেপ বিশ্বকে অনিরাপদ করে তুলছে। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ন্যাটো পূর্ব দিকে আর এক ইঞ্চিও সম্প্রসারিত হবে না; এমন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে তিনি একটি বড় ধরনের উস্কানি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এরপর ২০০৮ সালে বুখারেস্ট ঘোষণায় ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোর সদস্য করার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি আজকের ইউক্রেন সংঘাত।
তবে পুতিনের সেই সময়কার দীর্ঘমেয়াদী এবং আবেগপূর্ণ সতর্কবার্তাকে আটলান্টিকপন্থী নব্য-উদারবাদী গোষ্ঠী পুরোপুরি উপেক্ষা করেছিল। পরবর্তীতে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ২০১৮ সালের সম্মেলনেও বারবার ন্যাটোর সামরিক অবকাঠামো রাশিয়ার সীমান্তের দিকে এগিয়ে আসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ডনবাস অঞ্চলে রক্তক্ষয় বন্ধে মিনস্ক চুক্তির ওপর জোর দিলেও ইউরোপীয় এবং ইউক্রেনীয় নেতারা পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, সেই চুক্তি ছিল মূলত ইউক্রেনকে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়ার একটি কৌশল মাত্র।
বর্তমানে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের আয়োজকরা তাদের নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে আত্মসমালোচনা না করে বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের ওপর সমস্ত দোষ চাপাচ্ছেন। গত বছরের সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইউরোপীয় নেতাদের মুখের ওপর বলেছিলেন, তারা নিজেদের জনগণের সমর্থন হারিয়েছেন এবং আমেরিকার ওপর চিরকাল নির্ভরশীল থাকা তাদের উচিত হবে না। এর ফলে ইউরোপীয় শিবিরে একধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে। সম্মেলনের বর্তমান রিপোর্টে অভিযোগ করা হচ্ছে, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার কাঠামো ধ্বংস করছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প রাশিয়ার সাথে সরাসরি আলোচনায় বসা বা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে নিয়ে কঠোর পদক্ষেপের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউরোপকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।
ইউরোপীয় আটলান্টিকবাদীরা আসলে এমন এক বিশ্বে ফিরে যেতে চান যেখানে আমেরিকা নিজের স্বার্থ উদ্ধার করবে ঠিকই কিন্তু তাদের অন্তত দলের অংশ হিসেবে গণ্য করে একটু গুরুত্ব দেবে। তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে আমেরিকান আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু ১৯ বছর আগে পুতিনের দেওয়া সেই ভাষণের সারমর্ম ছিল এই, সমস্যাটা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নয় বরং পুরো ব্যবস্থার।