গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা জবাব দিতে ওই দিন থেকেই শুরু করে ইরান। এভাবেই টানা ২৭তম দিনে গড়িয়েছে এই যুদ্ধ। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনায় অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এতে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য।
সেই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতে সারাবিশ্বে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে অস্থির হয়ে উঠেছে জ্বালানির বাজার। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্যও নড়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আর এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির রূপই বদলে দিতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এক প্রতিবেদনে বলছে, ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই শক্তির পেছনে আরেকটি বড় ভিত্তি রয়েছে, তাহলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্য। অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের প্রভাব। ইরানের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বাজারে মার্কিন ডলারের এই আধিপত্যের বিরোধিতা করে আসছেন। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্র কম সুদে ঋণ নেওয়া এবং বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো সুবিধা পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন ডলারের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের অর্থনৈতিক কমিশনের সদস্য রাসুল বাখশি দাস্তজেরদি সোমবার বলেন, “ডলারের আধিপত্য ভাঙার জন্য হরমুজ প্রণালি হচ্ছে আমাদের লোহার হাতুড়ি।”
তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল করতে দেওয়া হবে ঠিকই- তবে শর্ত হচ্ছে, তেলের দাম অন্তত আংশিকভাবে ইরানি রিয়ালে নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি এমন খবরও এসেছে যে, চীনা মুদ্রা ইউয়ানে মূল্য নির্ধারণ করা হলে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে ইরান।
এই ধরনের শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের বেশিরভাগই ডলারে হয়। আর এটিই মূলত গোটা বিশ্বে ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে রাখে। তবে ইরানকে খুব বেশি কিছু করতে নাও হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ নিজেই ডলারের আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে সেখানকার উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে ডলারে বিনিয়োগ কমাতে পারে। একই সঙ্গে তেলের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধিও এই পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে।
পেট্রোডলারের জন্য চ্যালেঞ্জ
ডয়চে ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ মালিকা সাচদেভা এক নোটে সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধ ‘পেট্রোডলারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ’ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ডলারের আধিপত্য ক্ষয়ের সূচনা করতে পারে এবং ‘পেট্রোইউয়ান’-এর পথ খুলে দিতে পারে।
তার ভাষায়, “যদি এই ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সঞ্চয়ে ডলারের ব্যবহার এবং বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে এর অবস্থান বড় ধাক্কা খেতে পারে।”
পেট্রোডলার ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৭৪ সালে। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তিতে সৌদি আরব ডলারে তেল বিক্রি করতে এবং সেই অর্থ ডলারে বিনিয়োগ করতে সম্মত হয়, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। পরবর্তীতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটে।
তেল ডলারে লেনদেন হওয়ায় বিশ্বজুড়ে দেশগুলো ডলারে সঞ্চয় করতে উৎসাহিত হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ডলারে রিজার্ভ গড়ে তোলে। সাচদেভা বলেন, ‘“সমগ্র বিশ্ব মার্কিন ডলারে সঞ্চয় করে, কারণ তারা মার্কিন ডলারে লেনদেন করে। পেট্রোডলারই মার্কিন ডলারের আধিপত্যের ভিত্তি।”
এই আধিপত্যের ফলে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বেশি থাকে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক কম খরচে ঋণ নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের ভূমিকার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্ব অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।”
নিরাপত্তা কাঠামোতে ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পেট্রোডলার ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। আগে উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বাস করতো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু এখন ইরানের হামলায় সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাচদেভা বলেন, “এই যুদ্ধ নিরাপত্তা-বিনিময়ে তেল মূল্য নির্ধারণের কাঠামোকে নড়িয়ে দিয়েছে।”
একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হরমুজ প্রণালি অবরোধ ঠেকাতেও কার্যকর হয়নি, ফলে তেল ও গ্যাস রফতানি ব্যাহত হয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর নাভিন গিরিশঙ্কর বলেন, “ইরান আসলে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে।”
সংঘাত বাড়লে জ্বালানি অবকাঠামো, পানি লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট, ডাটা সেন্টার ও আর্থিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিও দিয়েছে তেহরান। তিনি বলেন, “এই ধরনের হামলা হলে এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে আস্থা কমে যাবে। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সেই আস্থাও তত ক্ষয় হবে।”
এই আস্থা কমে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলো ডলারভিত্তিক বিনিয়োগ কমাতে পারে এবং বিকল্প মুদ্রায় তেল বেচাকেনা শুরু করতে পারে। বিনিয়োগকারী রে ডালিও সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধেই হারবে না, অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও হারাবে।
তিনি বলেন, এতে মিত্র ও ঋণদাতাদের আস্থা কমবে, মুদ্রা হিসেবে ডলার দুর্বল হবে এবং স্বর্ণের মতো সম্পদের তুলনায় মার্কিন ডলারের মূল্য কমে যাবে।
নতুন সম্ভাবনা ‘কম্পিউট ডলার’
তবে গিরিশঙ্করের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। আর সেটাকে তিনি ‘কম্পিউট ডলার’ বলেছেন। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে চিপ ও এআই-সেবার লেনদেন যদি ডলারে হয়, তাহলে সেটিই পেট্রোডলারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই ক্ষেত্রেও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা তীব্র।
ডলারের অবস্থান এখনও শক্ত
এখনও উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন ডলারে বড় বিনিয়োগ ধরে রেখেছে। তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ, সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পেনশন তহবিলে ১ ট্রিলিয়ন ডলার রয়েছে।
এই বিনিয়োগ একদিনে সরানো সম্ভব নয়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অবকাঠামো মেরামত ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়বে, ফলে তারা সঞ্চয় থাকা মার্কিন ডলার ব্যবহার করতে বাধ্য হতে পারে।
আগেই চাপে ছিল পেট্রোডলার
সাচদেভা বলেন, যুদ্ধের আগেই পেট্রোডলার ব্যবস্থা চাপের মুখে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য এশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। বর্তমানে অঞ্চলের ৮৫ শতাংশ তেল এশিয়ায় যায়।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনে চার গুণ বেশি তেল বিক্রি করে এবং চীন চায় ইউয়ানে মূল্য নির্ধারণ হোক। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তাদের বিকল্প মুদ্রায় তেল বাণিজ্যে যেতে বাধ্য করেছে। সৌদি আরবও ‘প্রজেক্ট এমব্রিজ’-এর মতো মার্কিন ডলারবিহীন পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর পরীক্ষা চালাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন মুদ্রায় হতে পারে। যেমন- হরমুজ দিয়ে যাওয়া তেল ইউয়ানে, আর পশ্চিমা দেশগুলো মার্কিন ডলারে লেনদেন চালিয়ে যাবে।
এমনকি যদি তেল মার্কিন ডলারে লেনদেন অব্যাহতও থাকে, তবুও ঝুঁকি রয়েছে। কারণ দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তেল বাণিজ্য কমে গেলে মার্কিন ডলারের আধিপত্যও কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে এবং সামরিক শক্তি ধরে রাখা কঠিন হবে।
গিরিশঙ্কর বলেন, “একটি কারণে সবকিছু ভেঙে পড়বে না, তবে ৪০ বছরে গড়ে ওঠা ব্যবস্থারি ক্ষয় এখান থেকেই শুরু হতে পারে। এই যুদ্ধই হতে পারে সেই মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত।”