বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কঠোর নীতিমালা,যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার সম্মিলিত প্রভাবে প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৫-এ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা শুধু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিই দুর্বল করেনি, বরং অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদাও কমিয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কঠোর রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রভাব, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমির সঙ্গে নেপালের পরিস্থিতির মিল রয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য একটি সাধারণ ঝুঁকি, যা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোক্তা আস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
এর আগে ১০ এপ্রিল প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক এপ্রিল, ২০২৫-এ বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে এই পূর্বাভাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের অস্থিরতা এবং বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে।
তবে এডিবি পুরোপুরি হতাশার চিত্র দেয়নি। সংস্থাটি মনে করছে, জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমেছে এবং এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফিরতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে প্রবৃদ্ধিও পুনরায় ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি একটি দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক আকার কতটা বাড়ছে তার সূচক। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যই জিডিপি। সাধারণত প্রবৃদ্ধি বাড়লে মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এডিবি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছে না। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে আয়বৈষম্য বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে মোট ৫২১ কোটি ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। এর মধ্যে ২৫৭ কোটি ডলার ঋণ ও অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, আর বাকি অর্থ বেসরকারি খাত ও অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নের মাধ্যমে আসবে। এই সহায়তা অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত তদারকি ও মূলধনের ঘাটতির কারণে ব্যাংকিং খাত কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না এবং অনেক পরিবার আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলারের একটি সহায়তা কর্মসূচি দিয়েছে এডিবি, যা ব্যাংক তদারকি শক্তিশালী করা, সম্পদের মান উন্নয়ন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে ব্যবহৃত হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যও রয়েছে।