মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ঘোষণা দিয়েছেন, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রণীত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে স্টিভ উইটকফ বলেন, ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা এখন যুদ্ধবিরতি থেকে অগ্রসর হয়ে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান যে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা এখন কেবল যুদ্ধবিরতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গাজার নিরস্ত্রীকরণ, একটি টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে গাজায় একটি অস্থায়ী প্রশাসন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা উপত্যকাটির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা তদারকি করবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
স্টিভ উইটকফ তার ঘোষণায় স্পষ্ট করেছেন, দ্বিতীয় ধাপের সফলতার জন্য হামাসকে তাদের সমস্ত দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে, যার মধ্যে আটক জিম্মিদের মরদেহ দ্রুত ফেরত দেওয়ার শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যথায় হামাসকে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তবে গাজা সরকারের জনসংযোগ কার্যালয় অভিযোগ করেছে যে, গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল ১ হাজার ১৯০ বারের বেশি লঙ্ঘন করেছে, যার ফলে চার শতাধিক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে গাজার পুনর্গঠন ও নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া কতটুকু বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে গাজার ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুনর্গঠন কাজ শুরু করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ২০ দফার পরিকল্পনায় ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন যে, জাতিসংঘের সাবেক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এই বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন।
কাতার, তুরস্ক ও মিসর গাজায় ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এই কমিটির প্রধান হিসেবে আলি আবদেল হামিদ শাথ-এর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘ইসরায়েলের সাজানো নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়টি কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং এটি কেবল ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার একটি মাধ্যম।
মানবিক দিক থেকে গাজার পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তার জন্য গাজার সীমান্তগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানালেও ইসরায়েল তা অগ্রাহ্য করে চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গাজার দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েল ত্রাণ সরবরাহে বাধা দিয়ে তাদের দায়িত্ব লঙ্ঘন করছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার খান ইউনিসে এক চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।