বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি কাঠামো এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, একটি ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তর কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত একটি বৈপরিত্যময় বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। একদিকে, বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানির উল্লেখযোগ্য কোন মজুদ নেই কিন্তু জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হয়েছে আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির উপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে, বিপুল পরিমান নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তেমনভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়নি, বাংলাদেশের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জ্বালানির চাহিদা ৯৭ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। তার প্রায় ৭০ শতাংশ জ্বালানি আমদানী করতে হয়। আমদানিকৃত জ্বালানির মধ্যে রয়েছে কয়লা, এলএনজি ও জ্বালানি তেল ইত্যাদি। যার বাৎসরিক আমদানি ব্যয় কমবেশি দেড় লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল আমদানি ব্যয় জাতীয় অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উত্তরোত্তর চাপ বৃদ্ধি করছে। একইসাথে, জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ৫০-৩০০ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎস রয়েছে (ইউটিএস ২০১৯)। পাশাপাশি, বায়োগ্যাস সহ অন্যান্য উৎসের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ একটি নিম্ন ভূমির নদীমাতৃক দেশ, যা বিশ্বের ৭ম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ (জার্মান ওয়াচ ২০২১)। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষির উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর প্রধান অংশ এখনও গ্রামে বসবাস করে। একইসাথে, দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়ন উত্তরোত্তর জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি করছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের স্বকীয় আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে। যা হবে, উদ্ভাবনীমূলক, সেক্টর ভিত্তিক ও সমাজভিত্তিক। অথচ বাংলাদেশের জ্বালানি মহাপরিকল্পনা তৈরীতে বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও ভোক্তাদের কেন অংশগ্রহণ নেই। বিদেশীদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এই মহাপরিকল্পনা, প্রথাগত কাঠামো ও জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর একটি ব্যয়বহুল ও অপ্রমাণিত প্রযুক্তি নির্ভর পরিকল্পনা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান), ২০১০ বাতিল করা। এই আইনটি জ্বালানি খাতে জবাবদিহিতার সুযোগ সীমিত করে দিয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) আইন, ২০০৩-এর ধারা ৩৪(ক) পুনর্বহালের মাধ্যমে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বায়ত্তশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫' প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ২০৩০ ও ২০৪০ সালের যথাক্রমে ২০ ও ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির ২০২৫' আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে ২০০০-৩০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে, বেসরকারি অংশগ্রহণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন / বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নীতিমালা ২০২৫' প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এনডিসি (National Determined Contribution) প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে ২০৩৫ সালে ২৫%
নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ১০ বছর মেয়াদি কর অব্যাহতি এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আমদানীর উপর কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। জ্বালানি খাতে এ সকল সংস্কার একদিকে যেমন জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করার প্রয়াস নির্দেশ করে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্রিক রূপান্তরের নীতিগত ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে উল্লেখযোগ্য যে, এ সকল নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষ সমূহ কার্যকরভাবে যুক্ত করা হয়নি, তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে, এসব নীতি কাঠামো ও পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
তদুপরি, বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিমালার ক্ষেত্রে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। জ্বালানি রূপান্তর বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে একটি বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি এবং বাংলাদেশ সরকার এইসব বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির অংশ হলেও, বাংলাদেশের কোন জাতীয় জ্বালানি নীতিমালা বা জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা নেই। যা জ্বালানি রূপান্তরকে দীর্ঘমেয়াদে দিকনির্দেশনা দিতে পারে ও জ্বালানি খাতে আইন ও পরিকল্পনা প্রণয়নে দিকনির্দেশক ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতীয় জ্বালানি নীতিমালার ভিত্তিতে সেক্টর ও শিল্পভিত্তিক কৃষি, পরিবহন, তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত ইত্যাদি- পথনকশা তৈরি করা জরুরী। জাতীয় নীতিমালার অনুপস্থিতির কারণে, জ্বালানি হাতের আইন, পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়।
ইতোপূর্বে, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। জ্বালানী পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণে সমন্বয়হীনতার চিত্র নিচে তুলে ধরা হল ।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেট নেট-বিডি) প্রস্তাবিত নাগরিক ইশতেহার
১। জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালাঃ জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালা হবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যে কোনো আইন ও পরিকল্পনা প্রণয়নের ভিত্তি। যাতে জ্বালানি বিষয়ক সকল আইন, বিধিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সমন্বয় গড়ে উঠো জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা সহ যে কোনো আইন ও পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও পক্ষ সমূহের যথাযথ মতামত ও সম্মতি গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যে কোনো নীতিমালা, আইন ও পরিকল্পনা প্রণয়ন দেশীয় বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে হতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সহযোগিতা
নেয়া যেতে পারে।
২। আন্ত প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান, কমিশন সমূহের ভূমিকা, কার্যপদ্ধতি ও কার্যকারিতা বিস্তারিত পর্যালোচনা করে তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে ও জবাবদিহিতার আওতায়। আনতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও দেশীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। টাস্কফোর্সের সুপারিশক্রমে প্রয়োজনে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে বা পুরাতন প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে।
৩। জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ জাতীয় জ্বালানি নীতিমালার ভিত্তিতে জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর পথনকশা ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি রূপান্তর পথনকশা প্রণয়নে, বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন সাপেক্ষে বায়ু ও সৌর শক্তি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস, ওয়েভ ও টাইডাল বিদ্যুতের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি, উৎপাদন, সঞ্চালন ও ব্যবহার সকল ক্ষেত্রে বর্তমানে অর্জিত জ্বালানি দক্ষতা (বার্ষিক গড় 1.52%) ধরে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতি-কাঠামো ও প্রবণতার পাশাপাশি দেশীয় বাস্তবতা পর্যালোচনা সাপেক্ষে নেট-জিরো কার্বন ইমিশন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এ লক্ষ্যে, ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ২০৫০ সালে নেট-জিরো কার্বন ইমিশন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।
৪। খাত ও শিল্পভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, বরং কৃষি, পরিবহন, তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল ও নির্মাণ শিল্পের মতো খাতগুলোতে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সাথে মিল রেখে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে৷ বিশেষ করে, তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।
৫। জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি সার্বভৌমত্বঃ জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নিমিত্তে, ক্রমান্বয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক আমদানি নির্ভর ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহ বন্ধ করে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এই সময়ে কোন ভাবে নতুন কোন জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না। এই প্রক্রিয়ায়, দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে ধীরে ধীরে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনে সক্ষম হবে ৷
৬। নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন সংস্থার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)-কে একটি স্বাধীন, সক্ষম ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে, এই প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে৷ পাশাপাশি, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (SREDA)-এর দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।
৭। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনা : জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ ও বাজার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে । প্রতিযোগিতাহীন যে কোনো বিনিয়োগ আইন দ্বারা নিরুৎসাহিত করতে হবে৷ এমন একটি অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশি-বিদেশি। এবং মাঝারি এমনকি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সহজে ও আস্থার সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত ও সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে ব্লেন্ডেড ফাইনান্স-এর মতো বিনিয়োগ কাঠামো গ্রহণ করা যেতে পারে।
পাশাপাশি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পণ্য তালিকা তৈরি করতে হবে, তালিকাভুক্ত প্রতিটি পণ্য আমদানির উপর সব ধরনের শুল্ক ও কর আগামী ৫ বছরের জন্য শূন্য কর ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি, দেশে উৎপাদন সম্ভাবনাময় পণ্যের বিকাশ সংরক্ষণে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নকশা, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণে দেশীয় বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৮। উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর হতে হবে বাংলাদেশের স্বকীয় আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিজস্ব উদ্ভাবনে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে; নিজস্ব উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত পণ্য সংরক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে৷ এ ক্ষেত্রে যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে৷ পাশাপাশি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আলোকে প্রযুক্তি হস্তান্তরে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখার কৌশল ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানি-প্রযুক্তি আমদানির যেকোনো প্রচেষ্টায় দেশীয় দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতে
৯। নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও রপ্তানিযোগ্য খাত হিসেবে গড়ে তোলাঃ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির গবেষণা, উদ্ভাবন ও স্থানীয় উৎপাদন উদ্যোগে যথাযথ প্রণোদনা দিতে হবে। যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি একটি রপ্তানিযোগ্য খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে । এক্ষেত্রে, দক্ষ তরুণ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে, এ সংক্রান্ত কারিগরি শিক্ষার জন্য সহায়ক কারিকুলাম তৈরিসহ ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
১০। গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নেট মিটারিং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থা গ্রাহক বান্ধব করে সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি, নেট মিটারিং উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে গ্রাহকদের নেট-মিটার সরবরাহ করতে হবে।
১১। ভূমি অধিগ্রহণ ও খাদ্য নিরাপত্তা বাংলাদেশে বস্তুত কোনো পতিত বা অব্যবহৃত জমি নেই এবং খাদ্য নিরাপত্তার গভীর সংকট রয়েছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ভূমি ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে সর্বশেষ উপায় এক্ষেত্রে যদি ভূমি অধিগ্রহণ করতেই হয়, তাহলে, সবচেয়ে কম ব্যবহৃত ভূমি সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমি মালিক ও ভূমির ব্যবহারকারীকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
১২। পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা জ্বালানি রূপান্তর হতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে রূপান্তর প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও ন্যায্যতার মানদণ্ড নির্ধারণপূর্বক শক্তিশালী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে৷ যাতে ভূমির মালিক ও ব্যবহারকারী, কারখানা মালিক ও শ্রমিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ন্যায্যতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং একই সাথে তা জলবায়ু ন্যায্যতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
১৩। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নীতি প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় লিঙ্গ ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে নারীর চাহিদা মূল্যায়ন পূর্বক বৃত্তিমূলক, ডিপ্লোমা বা স্নাতক পর্যায়ে যথেষ্ট নারী শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা রাখতে করতে হবে। প্রযুক্তিগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
১৪। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে৷ কৌশলগত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ গ্যারান্টি, আঞ্চলিক গ্রিড ইন্টিগ্রেশন ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মতো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেট নেট-বিডি) ও একশনএইড বাংলাদেশ প্রস্তাবিত
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ
নাগরিক ইশতেহার